Tuesday , December 6 2016
Home / Slider / ফাঁসির মঞ্চে ৬ যুদ্ধাপরাধী
প্রকাশঃ 04 Sep, 2016, Sunday 5:14 PM || অনলাইন সংস্করণ
Saka_projonmo

ফাঁসির মঞ্চে ৬ যুদ্ধাপরাধী

ঢাকা: একাত্তরের মানবতাবিরোধী মামলায় এ নিয়ে ৬ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হল। হত্যা, গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত এইসব মানবতাবিরোধী অপরাধীরা স্বাধীনতার পর গত সাড়ে চার দশকে নানা ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে এদেশীয় রাজনৈতিক মহলের প্রশ্রয় ও মদদপুষ্ট হয়ে এরাই এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। হয়ে উঠেছেন অশেষ ক্ষমতাধর। গাড়িতে ঝুলিয়েছেন লাল-সবুজ পতাকা।

এক সময় বাঁক নেয় পথ। সেটা ২০১২ সালের ২৮ মে। সেদিন রাজধানীর শাহবাগে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে ছাত্র-তরুণ-সাধারণ জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এক সময় গণদাবির মুখে সরকার আইন সংশোধন করে। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে শুরু হয় যুদ্ধাপরাধ মামলার চূড়ান্ত বিচারপ্রক্রিয়া।ফাঁসি কার্যকর হয় কাদের থেকে কাসেম পর্যন্ত।

কাদের মোল্লার ফাঁসি
২০১০ সালের ১৩ জুলাই কাদের মোল্লাকে (কসাই কাদের নামে পরিচিতি পাওয়া) গ্রেফতারের পর তদন্ত শুরু হয় ওই বছরের ২১ জুলাই। ২০১২ সালের ২৮ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। ৩ জুলাই থেকে শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন ট্রাইব্যুনাল-২।

এই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশে সাধারণ মানুষ ও তরুণদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়। ক্ষুব্ধ মানুষ সেদিন বিকেল থেকে জড়ো হতে থাকে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে। প্রতিবাদী এই মানুষগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে তোলে শাহবাগ প্রতিবাদ-গণজাগরণ মঞ্চ।

গণদাবির একপর্যায়ে সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিটি) আইন সংশোধন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধনের ফলে আসামিপক্ষের মতো রাষ্ট্রপক্ষও রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সমান সুযোগ পায়। আগে আইনে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার সুযোগ ছিল না।

আইন সংশোধনের পর গত ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি  মৃত্যুদণ্ড  চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাজা থেকে অব্যাহতি চেয়ে পরদিন ৪ মার্চ আপিল করেন কাদের মোল্লা।

এরপর ১ এপ্রিল আপিলের শুনানি শুরুর  ৫৫ দিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।

৪৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাত ১০টা এক মিনিটে আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ায় এটি প্রথম কার্যকর হওয়া দণ্ড।

কামারুজ্জামানের ফাঁসি
একাত্তরে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে ১৪৪ জনকে হত্যা ও নারী নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে মো. কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে আসামিপক্ষ। সর্বেশষ গত বছরের ৩ নভেম্বর সোহাগপুর হত্যাকাণ্ডের দায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়।

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপির নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে পাশাপাশি দুটি মঞ্চে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। গত ২২ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে একাত্তরের এই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

এর আগে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাঁর বিরুদ্ধে আনা বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ সাতটি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এ বছর ১৬ জুন আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

অন্যদিকে এ বছরের ২৯ জুলাই, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আনা অভিযোগগুলো হলো ১৯৭১ সালের ৪ ও ৫ এপ্রিল সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের সাতজনকে অপহরণ ও এর মধ্যে ছয়জনকে হত্যা, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের মধ্য গহিরা হিন্দুপাড়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে গণহত্যা। এরপর ১৩ এপ্রিল কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা এবং একই দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় ৩২ জনকে হত্যা, বাড়িতে আগুন দেওয়া ও ধর্ষণের অভিযোগ।  ১৪ এপ্রিল সতীশ চন্দ্র পালিত হত্যা, তাঁর বাড়িতে আগুন ও পরিবারের সদস্যদের ধর্মান্তরে বাধ্য করা। আরো এক অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে বোয়ালখালীর শাখাপুর হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চলে হামলা ও ৭৬ জনকে হত্যা।

মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি
মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের আমির ও একাত্তরের বদর বাহিনীর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ১১ মে, ২০১৬। রাত ১২টা এক মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এ দণ্ড কার্যকর করা হয়।

আপিল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামীকে বলা হয়েছে একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নকশাকার। ২০০০ সালে সেই নিজামীই হন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতের প্রধান বা আমির। এমনকি বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) তিনি প্রথমে কৃষি ও পরে শিল্পমন্ত্রী হন। ওই সময়ে তাঁর গাড়িতে উড়ত জাতীয় পতাকা।

এ নিয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ে বলেন, নিজামীকে এ দেশের মন্ত্রী করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রমহারা দুই লাখ নারীকে অসম্মান করা হয়েছে। এটা জাতির জন্য লজ্জা, অবমাননা।

এর আগে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ আদালত এই রায় দেন। মামলাটি হাইকোর্টে বিচারাধীন।

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল নিজামীর বিরুদ্ধে মামলায় ফাঁসির রায় দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন নিজামী। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগেও নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল থাকে। এরপর ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন নিজামী।

সর্বশেষ গত ৫ মে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ নিজামীর আবেদন খারিজ করে দেন। প্রধান বিচারপতি মাত্র এক শব্দের আদেশে বলেন, ‘ডিসমিসড।’

মীর কাসেম আলীর ফাঁসি
সর্বশেষ শনিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত ১০টা ৩০ মিনিটি কার্যকর হলো ‘চট্টগ্রামের জল্লাদ’ বলে কুখ্যাত মীর কাসেম আলীর ফাঁসি। জামায়াতের প্রধান অর্থ জোগানদাতা মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, অপহরণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

২ অভিযোগে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। প্রথম অভিযোগ, ১৯৭১ সালে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে আলবদর সদস্যরা। মীর কাসেমের নির্দেশে তাঁকে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলের নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। পরে সেখানে নির্যাতনের শিকার আরও পাঁচজনের মরদেহের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ, মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা চট্টগ্রামের হাজারী গলির ১৩৯ নম্বর বাড়ি থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলে।

Check Also

bb

রিজার্ভ চুরির তদন্তের তথ্য দেয়া হবে ফিলিপাইনকে, রয়টার্সকে আইনমন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য ফিলিপাইনকে দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল ...